পদ্মা সেতু সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান

পদ্মা সেতু (সরকারি নামঃ পদ্মা বহুমুখী সেতু) শুধুমাত্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার নিদর্শন নয়, পদ্মা সেতু বাংলাদেশের একটি অহংকারের নাম। পদ্মা সেতু হচ্ছে বাংলাদেশের পদ্মা নদীর উপর নির্মিত একটি বহুমুখী সড়ক ও রেল সেতু। এর মাধ্যমে মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের সাথে শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলা যুক্ত হয়েছে। সেতুটি ২০২২ সালের ২৫ জুন উদ্বোধন করা হয়। এই দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে মাওয়া প্রান্ত দিয়ে টোল প্রদান করে প্রথমবারের মত আনুষ্ঠানিকভাবে পদ্মা সেতুতে আরোহন করেন এবং এর মাধ্যমে সেতুটি উন্মুক্ত করা হয়।

দুই স্তর বিশিষ্ট স্টিল ও কংক্রিট নির্মিত ট্রাসের এই সেতুর উপরের স্তরে চার লেনের সড়ক পথ এবং নিচের স্তরে একটি একক রেলপথ রয়েছে। পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীর অববাহিকায় ৪২টি পিলার ও ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের ৪১টি স্প্যানের মাধ্যমে মূল অবকাঠামো তৈরি করা হয়। সেতুটির দৈর্ঘ্য ৬.১৫০ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ১৮.১০ মিটার।

২০০১ সালের ৪ জুলাই মাওয়া-জাজিরা প্রান্তে পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০০৬-২০০৭ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে, তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে।

পদ্মা সেতু সম্পর্কে প্রথমে সাধারণ কিছু তথ্য দেয়া হবে এরপর সাধারণ জ্ঞান প্রশ্নোত্তর আকারে নীচে দেয়া আছে।

পদ্মা সেতু সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান - পদ্মা সেতু [ Padma Bridge ]
পদ্মা সেতু [ Padma Bridge ]

Table of Contents

পদ্মা সেতু ইতিহাস:

১৯৯৮ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর, সরকার রাজধানী ও দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা-খুলনা মহাসড়কে পদ্মা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের জন্য ৩,৬৪৩.৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের প্রস্তাব করে। ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১৮.১০ মিটার চওড়া উক্ত সেতুটিকে দেশের সম্ভাব্য দীর্ঘতম সেতু হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছিল। প্রস্তাবে ১৯৯৯ সালের জুলাই মাসে সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করে ২০০৪ সালের জুনে শেষ করার কথা জানানো হয়। নির্মাণের জন্য প্রস্তাবিত টাকার ২৬৯৩.৫০ কোটি টাকা বিদেশী উৎস থেকে এবং ৭৫০ কোটি টাকা জাতীয় উৎস থেকে জোগান দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

পরে ১৯৯৯ সালের মে মাসে উক্ত সেতু প্রকল্পের জন্য প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই পরীক্ষা শুরু হয়। ২০০১ সালের ৪ জুলাই মাওয়া-জাজিরা প্রান্তে সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৮ম সাধারণ নির্বাচনের পর, পরবর্তী সরকারের পরামর্শক কমিটি ১. পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া পয়েন্ট, ২. দোহার-চরভদ্রাসন পয়েন্ট, ৩. মাওয়া-জাজিরা পয়েন্ট এবং ৪. চাঁদপুর-ভেদরগঞ্জ পয়েন্টে প্রাক-বাস্তবায়নযোগ্যতার সমীক্ষা করায়। ২০০৪ সালে জাইকা নিয়োজিত পরামর্শক নিপ্পন কোয়েই পদ্মা সেতু নির্মাণকল্পে বিস্তারিত সমীক্ষা পরিচালনার পর আগের নির্ধারিত মাওয়া-জাজিরা পয়েন্টেই সেতু নির্মাণের পরামর্শ দেয়।

২০০৬-২০০৭ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে, তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার এ সেতু নির্মাণের জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তা পাবার জন্য আলোচনা শুরু করে। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর ২০০৭ সালের ২০ অগাস্ট তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার একনেকের বৈঠকে ১০,১৬১ কোটি টাকায় পদ্মা সেতু প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। তখন ২০১৫ সালের মধ্যে সেতুটি নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এই জন্য সেই বছর পদ্মা সেতুর বিশদ নকশা প্রণয়নে দরপত্রও আহ্বান করা হয়।

২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে, আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতেহারে পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেয়। নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। তখন ২০১১ সালের মধ্যে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করার কথা জানানো হয়। এই জন্য ২০০৯ সালে নকশা প্রণয়নের জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হয় ও ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হয়। সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাইকা ও ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক অর্থ যোগান দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। ২০০৯ সালের ২৮ এপ্রিল বিশ্বব্যাংকের সাথে বাংলাদেশ ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর করে।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বাসেক) ২০১০ সালের এপ্রিলে পদ্মা সেতুর মূল অবকাঠামো নির্মাণে প্রকল্পের জন্য প্রাকযোগ্যতা দরপত্র আহ্বান করে। প্রথম পরিকল্পনা অনুসারে, ২০১১ সালের শুরুর দিকে সেতুর নির্মাণ কাজ আরম্ভ হওয়ার কথা ছিল এবং ২০১৩ সালের মধ্যে প্রধান কাজগুলো শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরিকল্পনা অনুসারে প্রকল্পটি তিনটি জেলাকে অন্তর্ভুক্ত করবে: মুন্সীগঞ্জ (মাওয়া পয়েন্ট/উত্তর পাড়), শরীয়তপুর এবং মাদারীপুর (জঞ্জিরা/দক্ষিণ পাড়)। এটির জন্য প্রয়োজনীয় এবং অধিগ্রহণকৃত মোট জমির পরিমাণ ৯১৮ হেক্টর।

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্মা সেতু প্রকল্প পাস করলেও, আওয়ামী লীগ সরকার এসে রেলপথ সংযুক্ত করে ও ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি প্রথম দফায় সেতুর ব্যয় সংশোধন করে। তখন এর ব্যয় ধরা হয় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। পরে পদ্মা সেতুর ব্যয় আরও আট হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়। ফলে তখন পদ্মা সেতুর ব্যয় দাঁড়ায় সব মিলিয়ে ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা।

২০১১ সালের এপ্রিল মাসে বিশ্বব্যাংকের সাথে বাংলাদেশের ১২০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণচুক্তি হয়। একই বছরের ১৮ মে জাইকার সঙ্গে সরকারের ৪১ কোটি ৫০ লাখ ডলার এবং ৬ জুন এডিবির সঙ্গে ৬১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের ঋণচুক্তি হয়। ২০১১ সালের ১০ অক্টোবরে দুর্নীতির অভিযোগ এনে পদ্মা প্রকল্পে অর্থায়ন স্থগিত করে বিশ্বব্যাংক। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মসিউর রহমানের নামও দুর্নীতির অভিযোগের সাথে যুক্ত হয়। ২০১১ সালের ১৪ নভেম্বর সেতু বিভাগের সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াকে বদলি করে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয় ও ৫ ডিসেম্বর তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।

২০১২ সালের ২৯ জুন সেতুর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দরপত্রে অংশ নেওয়া এসএনসি-লাভালিনের সঙ্গে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তিটি বাতিল করে। পরে অন্য দাতা সংস্থাগুলোও তার প্রতিশ্রুত ঋণচুক্তি বাতিল করে। ২০১২ সালের ৪ জুলাই জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করার কথা বলেন। ৮ জুলাই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ পরিকল্পনা সংসদে পেশ করেন তিনি। ২০১২ সালের ৯ জুলাই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রিসভা। বিশ্বব্যাংকের শর্তের কারণে ২৩ জুলাই তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় ও ২৪ জুলাই সচিব মোশারেফ হোসেন ভূইয়াকে ওএসডি করা হয়।

সরকারের অনুরোধে ২০ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাংক প্রকল্পে পুনরায় সম্পৃক্ত হতে রাজি হলেও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অর্থায়ন করতে অসম্মতি জানায়। ২০১২ সালের ১৭ ডিসেম্বর সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াকে প্রধান আসামি করে সাত জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। ২৬ ডিসেম্বর রাজধানীর শাহবাগ এলাকা থেকে মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয় দুদক। গ্রেপ্তার করা হয় আরও দু’জনকে। ২০১৩ সালের ১৬ জানুয়ারি মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করে সরকার। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জামিনে মুক্ত হন তিনি।

২০১৩ সালের ৩১ জানুয়ারি পদ্মা সেতুতে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থ আর নেওয়া হবে না সরকার এমন সিদ্ধান্তের কথা জানায়। ২০১৩ সালের ২৬ জুন আবার দরপত্র আহ্বান করা হয়।

২০১৪ সালের ১৭ জুন পদ্মা বহুমুখী সেতুটি নির্মাণে চায়না রেলওয়ে মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপের সঙ্গে চুক্তি করে সেতু বিভাগ। ২০১৪ সালে ১৭ সেপ্টেম্বর দুদক জানায় পদ্মা সেতুতে কোন দুর্নীতি হয়নি। ২৬ অক্টোবর পদ্মা সেতু দুর্নীতির মামলার অবসান হয়। ২০১৪ সালের ২৬ নভেম্বর মূল পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

পদ্মা সেতু [ Padma Bridge ]
পদ্মা সেতু [ Padma Bridge ]

পদ্মা সেতুর নকশা:

পদ্মা বহুমুখী সেতুর সম্পূর্ণ নকশা এইসিওএমের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরামর্শকদের নিয়ে গঠিত একটি দল তৈরি হয়। বাংলাদেশের প্রথম বৃহৎ সেতু প্রকল্প যমুনা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেল তৈরি করা হয়। অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীকে ১১ সদস্যের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সভাপতি নিযুক্ত করা হয়। এ প্যানেল সেতুর নকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন পর্যায়ে প্রকল্প কর্মকর্তা, নকশা পরামর্শক ও উন্নয়ন সহযোগীদের বিশেষজ্ঞ পরামর্শ প্রদান করে।

পদ্মা সেতুর কর্মপরিকল্পনা:

পদ্মা সেতুর ভৌত কাজকে মূলত পাঁচটি প্যাকেজে ভাগ করা হয় যথা— (ক) মূল সেতু, (খ) নদী শাসন, (গ) জাজিরা সংযোগকারী সড়ক, (ঘ) টোল প্লাজা ইত্যাদি। মাওয়া সংযোগকারী সড়ক, টোল প্লাজা ইত্যাদি এবং মাওয়া ও জাজিরা সার্ভিস এলাকা। প্রকল্পে নিয়োজিত নকশা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘মনসেল-এইকম’ ভৌত কাজের ঠিকাদার নিয়োগের প্রাক-যোগ্যতা দরের নথি প্রস্তুত, টেন্ডার আহ্বানের পর টেন্ডার নথি মূল্যায়ন, টেন্ডার কমিটিকে সহায়তাসহ এ-সংক্রান্ত যাবতীয় কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেল নকশা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাজ তদারক করত। ভৌত কাজের বিভিন্ন প্যাকেজের জন্য দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছিল। পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি।

পদ্মা সেতু, মাওয়া পাড় [ Padma Bridge, Mawa End ]
পদ্মা সেতু, মাওয়া পাড় [ Padma Bridge, Mawa End ]

পদ্মা সেতুর পাইলিংয়ের সমস্যা:

প্রথম দিকে সেতু নির্মাণকারী প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞদের পদ্মা নদীর তলদেশের মাটি খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয়। তলদেশে স্বাভাবিক মাটি পাওয়া যায়নি। সেতুর পাইলিং কাজ শুরুর পরে সমস্যা দেখা যায়। প্রকৌশলীরা নদীর তলদেশে কৃত্রিম প্রক্রিয়ায় মাটির বদলে নতুন মাটি তৈরি করে পিলার গাঁথার চেষ্টা করে। স্ক্রিন গ্রাউটিং নামের এই পদ্ধতিতেই বসানো হয় পদ্মাসেতু। এ প্রক্রিয়ায় ওপর থেকে পাইপের ছিদ্র দিয়ে রাসায়নিক নদীর তলদেশে পাঠিয়ে মাটির শক্তিমত্তা বাড়ানো হয়। তারপর ওই মাটিতে পিলার গেঁথে দেওয়া হয়।

এ পদ্ধতিতে পাইলের সঙ্গে স্টিলের ছোট ছোট পাইপ ওয়েল্ডিং করে দেওয়া হয়। পাইপের ভেতর দিয়ে এক ধরনের কেমিক্যাল পাঠিয়ে দেওয়া হয় নদীর তলদেশের মাটিতে। কেমিক্যালের প্রভাবে তখন তলদেশের সেই মাটি শক্ত রূপ ধারণ করে। একপর্যায়ে সেই মাটি পাইলের লোড বহনে সক্ষম হয়ে ওঠে। তখন আর পাইল বসাতে কোনো বাধা থাকে না।

পদ্মা সেতুর নির্মাণব্যয়:

পদ্মা সেতু নির্মাণে মোট খরচ করা হয় ৩০ হাজার ১৯৩ দশমিক ৩৯ কোটি টাকা। এসব খরচের মধ্যে রয়েছে সেতুর অবকাঠামো তৈরি, নদী শাসন, সংযোগ সড়ক, ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও পরিবেশ, বেতন-ভাতা ইত্যাদি। বাংলাদেশের অর্থ বিভাগের সঙ্গে সেতু বিভাগের চুক্তি অনুযায়ী, সেতু নির্মাণে ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা ঋণ দেয় সরকার। ১ শতাংশ সুদ হারে ৩৫ বছরের মধ্যে সেটি পরিশোধ করবে সেতু কর্তৃপক্ষ।

পদ্মা সেতু, মাওয়া পাড় [ Padma Bridge, Mawa End ]
পদ্মা সেতু, মাওয়া পাড় [ Padma Bridge, Mawa End ]

পদ্মা সেতুর নির্মাণের সময়ক্রম:

মূল সেতুর জন্য চীনের মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশনকে নিযুক্ত করা হয়। চীনের সিনোহাইড্রো কর্পোরেশন নদী শাসনের কাজ করে। বাংলাদেশের আবদুল মোনেম লিমিটেডকে দুটি সংযোগ সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণের চুক্তি দেওয়া হয়। অক্টোবর ২০১৭ সালে মূল নির্মাণ কাজ শুরু হয়।

২০১৭

  • ৩০ সেপ্টেম্বর দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পদ্মা সেতুতে পিলারের ওপর বসানো হয় প্রথম স্প্যান। শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিলারের ওপর ভাসমান ক্রেনের সাহায্যে এই স্প্যান বসানো হয়।
  • ১১ মার্চ ৩৯ ও ৪০ নম্বর পিলারের ওপর বসে তৃতীয় স্প্যান।
  • ১৩ মে ৪০ ও ৪১ নম্বর পিলারের ওপর চতুর্থ স্প্যান বসানো হয়।
  • ২৯ জুন সেতুর পঞ্চম স্প্যান বসানো হয়েছে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার নাওডোবা এলাকায়।

২০১৮

  • জানুয়ারি মাসে জাজিরা প্রান্তের তীরের দিকের ষষ্ঠ শেষ স্প্যান বসে।
  • ২৮ জানুয়ারি পদ্মা সেতুর ৩৮ ও ৩৯ নম্বর পিলারের ওপর দ্বিতীয় স্প্যান ৭বি সুপার স্ট্রাকচার বসানো হয়। প্রথম স্প্যান বসানোর প্রায় চার মাস পর জাজিরার নাওডোবা প্রান্তে তিন হাজার ১৫০ টন ধারণ ক্ষমতার এ স্প্যান বসানো হয়।
  • মাওয়া প্রান্তে ৪ ও ৫ নম্বর পিলারের ওপর বসে সপ্তম স্প্যান।

২০১৯

  • ২০ ফেব্রুয়ারি জাজিরা প্রান্তে ৩৬ ও ৩৫ নম্বর পিলারের ওপর অষ্টম স্প্যান বসানো হয়।
  • ২২ মার্চ সেতুর ৩৫ ও ৩৪ নম্বর পিলারের ওপর বসে নবম স্প্যানটি।
  • ১০ এপ্রিল মাওয়া প্রান্তে ১৩ ও ১৪ নম্বর পিলারের ওপর দশম স্প্যান।
  • ২৩ এপ্রিল শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে ৩৩ ও ৩৪ নম্বর পিলারের ওপর ১১তম স্প্যান বসে।
  • ১৭ মে মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তের মাঝামাঝি স্থানে ২০ ও ২১ নম্বর পিলারের ওপর ১২তম স্প্যান বসানো হয়।
  • ২৫ মে ১৪ ও ১৫ নম্বর পিলারের ওপর ১৩তম স্প্যান ৩বি বসানো হয়।
  • ২৯ জুন ১৪তম স্প্যান বসানো হয়।
  • ২২ অক্টোবর জাজিরা প্রান্তে ২৪ ও ২৫ নম্বর পিলারের ওপর পদ্মা সেতুর ১৫তম স্প্যান বসানো হয়।
  • ২৭ নভেম্বর মাওয়া প্রান্তে ১৬ ও ১৭ নম্বর পিলারের ওপর ১৬তম স্পানটি বসানো হয়।
  • ২০১৯ সালেল ৫ ডিসেম্বর পিলার ২২ ও ২৩–এর ওপর মূল সেতুর ১৭তম স্প্যানটি বসানো হয়।
  • ১১ ডিসেম্বর পদ্মা সেতুর ১৮তম স্প্যান বসানো হয়।
  • ১৮ ডিসেম্বর বসানো হয় ১৯তম স্প্যান।
  • ৩১ ডিসেম্বর মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে ১৮ ও ১৯ নম্বর পিলারের উপরে বসানো হয় পদ্মা সেতুর ২০তম স্প্যান। ধূসর রঙের ‘৩-এফ’ নম্বরের স্প্যানটি খুঁটির উপরে বসানো হয়।

২০২০

  • ১৪ জানুয়ারি পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তে ৩২ ও ৩৩ নম্বর পিলারের ওপর বসানো হয় ২১তম স্প্যান।
  • ২৩ জানুয়ারি মাওয়া প্রান্তের ৫ ও ৬ নম্বর পিলারের ওপর বসানো হয় ২২তম স্প্যান।
  • ২ ফেব্রুয়ারি বসেছে ২৩তম স্প্যান।
  • ১১ ফেব্রুয়ারি বসেছে ২৪তম স্প্যান।
  • ২১ ফেব্রুয়ারি ২৫তম স্প্যান বসানো হয়।
  • ১০ মার্চ পদ্মা সেতুর ২৬তম স্প্যান বসানো হয়। শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে ২৮ ও ২৯ নম্বর পিলারের ওপর বসানো হয় এই স্প্যান।
  • ২০ এপ্রিল ২৭তম স্প্যানটি পিলার-২৭ ও ২৮-এর ওপর বসানো হয়।
  • ১১ এপ্রিল জাজিরা প্রান্তে বসানো হয় ২৮তম স্প্যান।
  • ৪ মে মাওয়া প্রান্তে সেতুর ১৯ ও ২০তম পিলারের ওপর ‘৪এ’ আইডি নম্বরে সেতুর ২৯তম স্প্যান বসানো হয়।
  • ৩০ মে জাজিরা প্রান্তে সেতুর ২৬ ও ২৭ নম্বর পিলারের (খুঁটি) ওপর বসানো হয় ৩০তম স্প্যান।
  • ১০ জুন পদ্মা সেতুর ৩১তম স্প্যান বসানো হয়। সেতুর ২৫ ও ২৬ নম্বর পিয়ারে শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে ৫-এ স্প্যান বসানো হয়।
  • ১১ অক্টোবর পদ্মা সেতুর ৩২তম স্প্যানটি বসানো হয়। পদ্মায় তীব্র স্রোতের কারণে প্রথম দিন বসানো সম্ভব না হলেও প্রকৌশলীদের প্রচেষ্টায় দ্বিতীয় দিনে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে সেতুর ৪ ও ৫ নম্বর পিলারের ওপর স্প্যানটি বসানো হয়। বন্যা ও পদ্মা নদীর তীব্র স্রোতের কারণে স্প্যানটি বসানো হয় চার মাস পর।
  • ২০ অক্টোবর বসানো হয় সেতুর ৩৩তম স্প্যান।
  • ২৫ অক্টোবর ৩৪তম স্প্যান বসানো হয় সেতুর মাওয়া প্রান্তে ৭ ও ৮ নম্বর পিলারের ওপর স্প্যান ২-এ।
  • ৩১ অক্টোবর ৩৫তম স্প্যান বসানো হয় মাওয়া প্রান্তে ৮ ও ৯ নম্বর পিলারের ওপর স্প্যান ২-বিতে।
  • ৬ নভেম্বর পদ্মা সেতুর ৩৬তম স্প্যান বসানো হয় সেতুর মাওয়া প্রান্তের ২ ও ৩ নম্বর পিলারের ওপর।
  • ১৩ নভেম্বর ৩৭তম স্প্যান ‘২-সি’ মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে ৯ ও ১০নং পিলারের ওপর বসানো হয়।
  • ২১ নভেম্বর মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তের ১ ও ২ নম্বর খুঁটির ওপর ৩৮তম স্প্যানটি সফলভাবে বসানো হয়।
  • ২৭ নভেম্বর ৩৯ তম স্প্যান বসানোর কাজ সম্পন্ন হয়। স্প্যানটি মুন্সিগঞ্জের মাওয়া প্রান্তের ১০ ও ১১ নম্বর পিলারের ওপর ‘২-ডি’ স্প্যানটি বসানো হয়।
  • ৪ ডিসেম্বর পদ্মা সেতুর ৪০তম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয় সেতুর ছয় হাজার মিটার।
  • ১০ ডিসেম্বর পদ্মা সেতুর ১২ ও ১৩ তম পিলারে ৪১তম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয় পুরো পদ্মা সেতু।

২০২১

  • ২৩ আগস্ট সর্বশেষ সড়ক স্ল্যাব বসানো হয়।

২০২২

  • ৪ জুন থেকে ১০ জুন পর্যন্ত ধাপে ধাপে সেতুর ৪১৫ বাতির পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। ১৪ জুন একযোগে সবগুলো বাতি জ্বালানো হয়।
  • ২৫ জুন শেখ হাসিনা সেতুটি উদ্বোধন করেন।

পদ্মা সেতুর চুক্তিবদ্ধ সংস্থা:

২০১৪ সালের ১৭ জুন পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ সরকার ও চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানির মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে চীনের কোম্পানিটি পদ্মাসেতু নির্মাণের দায়িত্ব পায়। পদ্মা সেতু নির্মাণে ২০১০ সালে প্রথম দরপত্র আহবান করা হলে সেখানে প্রাক-যোগ্যত অর্জনের জন্য ৪০টি কোম্পানি অংশ নেয়। বিশ্বব্যাংক, জাইকা ও এডিবির তত্বাবধানে এদের মধ্যে ৫টি কোম্পানিকে বাছাই করা হয়। পরে বিশ্বব্যাংকের আপত্তির কারণে একটি কোম্পানি বাদ পড়ে যায়। আর্থিক প্রস্তাব আহ্বান করলে শুধুমাত্র চীনের এই কোম্পানিটি আর্থিক প্রস্তাব জমা দেয়। কোম্পানিটি চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেডের অধীনস্থ।

২০২২ সালের এপ্রিলে সেতু বিভাগের অধীনে, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ কর্তৃক পদ্মা বহুমুখী সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ ও টোল আদায়ে কোরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে করপোরেশন ও চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কম্পানি লিমিটেডকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

পদ্মা সেতুর উদ্বোধন:

২০২২ সালের ২৫ জুন সেতুটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন ও পরের দিন থেকে এটি সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। উদ্বোধন উপলক্ষে স্মারক ডাকটিকিট উন্মোচন করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান ও জঙ্গী হেলিকপ্টার অ্যারোবেটিক ডিসপ্লে ও ফ্লাইপাস প্রদর্শন করে। সেতুটির উদ্বোধন উপলক্ষে পাকিস্তান, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভূটান, চীন, রাশিয়া, ডেনমার্কসহ পৃথিবীর অনেক দেশের সরকার ও রাষ্ট্রদূত অভিনন্দন বার্তা পাঠায়। তাছাড়া উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধিও বাংলাদেশ সরকারকে অভিনন্দন জানান।

উদ্বোধনের পর জনসাধারণের জন্য সেতুটি উন্মুক্ত করে দেয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে বেশ কিছু বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। উন্মুক্ত করে দেবার প্রথম দিনই গতিসীমা অমান্য করে মোটরবাইক চালাতে গিয়ে সেতুতে দুর্ঘটনায় দুজনের মৃত্যু ঘটে। ফলশ্রুতিতে সেতুতে দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনাসদস্যরা টহল কার্যক্রম জোরদার করেন ও একইসাথে ভ্রাম্যমাণ আদালত সেতুতে অভিযান পরিচালনায় নামে। নিষিদ্ধ করা হয় সেতুতে যানবাহন থামানো, পার্কিং‌, পায়ে হেঁটে পার হওয়া ও মোটরসাইকেল চলাচল।

পদ্মা সেতুর টোল:

২৮ এপ্রিল ২০২২ সালে সেতু মন্ত্রণালয় পদ্মা সেতুর জন্য টোলের হার প্রস্তাব করে ও তা অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাঠায়। ১৭ মে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় বিভিন্ন পরিবহনের জন্য আলাদা আলাদা টোলের হার নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। বিস্তারিত দেখুন

পদ্মা সেতুর অর্থনৈতিক গুরুত্ব:

পদ্মা বহুমুখী সেতুর মাওয়া-জাজিরা পয়েন্ট দিয়ে নির্দিষ্ট পথের মাধ্যমে বাংলাদেশের কেন্দ্রের সাথে দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের সরাসরি সংযোগ তৈরি হয়। এই সেতুটি অপেক্ষাকৃত অনুন্নত অঞ্চলের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিল্প বিকাশে উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান রাখবে। প্রকল্পটির ফলে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৪৪,০০০ বর্গ কিঃমিঃ (১৭,০০০ বর্গ মাইল) বা বাংলাদেশের মোট এলাকার ২৯% অঞ্চলজুড়ে ৩ কোটিরও অধিক জনগণ প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবে। ফলে প্রকল্পটি দেশের পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। সেতুটিতে ভবিষ্যতে রেল, গ্যাস, বৈদ্যুতিক লাইন এবং ফাইবার অপটিক কেবল সম্প্রসারণের ব্যবস্থা রয়েছে। এই সেতুটি নির্মিত হলে বাংলাদেশের জিডিপি ১.২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে।

পদ্মা সেতুর বিতর্ক ও গুজব:

২০১৯ সালের জুলাই মাসে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজে মানুষের মাথা প্রয়োজন বলে ফেসবুকে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এতে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে অপহরণকারী ধারণা করে অনেক মানসিক ভারসাম্যহীনদের মারধর ও গণপিটুনির ঘটনা ঘটে; এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। পরে এ তথ্যকে গুজব ও ভিত্তিহীন উল্লেখ করে ৯ জুলাই ২০১৯ তারিখে সেতু নির্মাণ কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমগুলোতে বিজ্ঞপ্তি পাঠায়। বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো বন্ধে গবেষকরা সেতু কর্তৃপক্ষকে সেতুটি নির্মাণের খুঁটিনাটি সকল তথ্য জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার পরামর্শ দেন।

 

পদ্মা সেতু সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান
পদ্মা সেতু সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান

 

পদ্মা সেতু সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান প্রশ্ন:

পদ্মা সেতু এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে বাস্তবায়নকৃত সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট। বিভিন্ন সরকারি চাকরির পরীক্ষায় এই সম্পর্কে প্রশ্ন আসবে সেটাই স্বাভাবিক। আমরা এখানে পদ্মা সেতু সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান প্রশ্ন ও উত্তর সন্নিবেশন করেছি, যা আপনাদেরকে সাহায্য করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

পদ্মা সেতু সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান ও প্রশ্নোত্তর (MCQ):

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর প্রকল্পের নাম কী?

উত্তরঃ পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর প্রকল্প নকশাকারী প্রতিষ্ঠানের নাম কী?

উত্তরঃ এইসিওএম (AECOM)

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতু প্রকল্পে কত কিলোমিটার নদী শাসন করা হয়েছে?

উত্তরঃ ১৪ কিলোমিটার।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতু প্রকল্পে নদী শাসনের কাজ কোন কোম্পানী করেছে?

উত্তরঃ সিনোহাইড্রো কর্পোরেশন লিমিটেড (Sinohydro Corporation Limited)

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকায় মোট কতটি বৃক্ষ রোপন করা হয়েছে?

উত্তরঃ মোট ১ লক্ষ ৬৯ হাজার ৯৫৭ টি বৃক্ষ।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতু প্রকল্পে মোট কত জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে?

উত্তরঃ ২৫৪১.৭৯ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে।

প্রশ্নঃ পদ্মা বহুমুখী সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ ও টোল আদায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কারা?

উত্তরঃ কোরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে করপোরেশন ও চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড।

প্রশ্নঃ পদ্মা বহুমুখী সেতুর ফলে দেশের সার্বিক জিডিপি কতটুকু বৃদ্ধি পাবে?

উত্তরঃ ১.২৩ শতাংশ [ তবে এর বেশিও হতে পারে। অন্যান্য বড় প্রকল্পগুলো চালু হবার সাথে সাথে আরও বাড়তে থাকবে]।

প্রশ্নঃ পদ্মা বহুমুখী সেতুর ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিডিপি কতটুকু বৃদ্ধি পাবে?

উত্তরঃ ২.৩ শতাংশ।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর ঢাকার সাথে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কতটি জেলাকে সংযুক্ত করবে?

উত্তরঃ ১৯টি জেলাকে।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর ভৌত কাজকে কয়টি প্যাকেজে ভাগ করা হয়?

উত্তরঃ মূলত পাঁচটি প্যাকেজে ভাগ করা হয়।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য কত?

উত্তরঃ পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিলোমিটার।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতু কত কিলোমিটার?

উত্তরঃ পদ্মা সেতু ৬.১৫ কিলোমিটার।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর পিলার কয়টি?

উত্তরঃ পদ্মা সেতুর পিলার ৪২ টি।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতু প্রকল্পে নদী শাসন হয়েছে কত কিলোমিটার ?

উত্তরঃ পদ্মা সেতু প্রকল্পে নদী শাসন হয়েছে দুই পাড়ে ১৪ কিলোমিটার।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর স্প্যান কয়টি?

উত্তরঃ পদ্মা সেতুর স্প্যান ৪১ টি।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ কত কিলোমিটার ?

উত্তরঃ পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য: ৬.১৫ কিলোমিটার (২০,২০০ ফুট) প্রস্থ: ১৮.১০ মিটার (৫৯.৪ ফুট)

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর সংযোগ সড়ক কত কিলোমিটার?

উত্তরঃ পদ্মা সেতুর সংযোগ সড়ক দুই প্রান্তে ১৪ কিলোমিটার।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতু কোন জেলায় অবস্থিত?

উত্তরঃ পদ্মা সেতু বাংলাদেশের পদ্মা নদীর উপর নির্মিত একটি বহুমুখী সড়ক ও রেল সেতু। এর মাধ্যমে মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ের সাথে শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলা যুক্ত হয়েছে।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর পিলার সংখ্যা কয়টি ?

উত্তরঃ পদ্মা সেতুর পিলার সংখ্যা ৪২ টি ।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর স্প্যান সংখ্যা কয়টি ?

উত্তরঃ পদ্মা সেতুর স্প্যান সংখ্যা ৪১ টি।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর প্রস্থ কত?

উত্তরঃ পদ্মা সেতুর প্রস্থ ১৮.১০ মিটার

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর কাজ কবে শুরু হয়?

উত্তরঃ ৭ ডিসেম্বর ২০১৪ সালে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হয়।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতু নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান কে?

উত্তরঃ পদ্মা সেতু নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর স্প্যান কয়টি বসানো হয়েছে ?

উত্তরঃ পদ্মা সেতুর ৪১ টি স্প্যান বসানো হয়েছে।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতু বিশ্বের কততম সেতু?

উত্তরঃ পৃথিবীতে অসংখ্য সেতু রয়েছে। দৈর্ঘ্যের দিক বিবেচনায় পদ্মা সেতু হচ্ছে বিশ্বের ১২২ তম দীর্ঘ সেতু।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর দুই প্রান্তের জেলার নাম কি?

উত্তরঃ মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ের সাথে শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলা যুক্ত হয়েছে।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর বাজেট কত?

উত্তরঃ পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতু নির্মাণে কোন দেশ অর্থায়ন করেছে ?

উত্তরঃ বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব সম্পদ থেকে অর্থায়ন করা হয়েছে।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতু প্রকল্পে নদী শাসন ব্যয় কত?

উত্তরঃ পদ্মা সেতু প্রকল্পে নদীশাসন ব্যয় ৮ হাজার ৭০৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর মূল সেতুতে মোট ব্যয় কত?

উত্তরঃ পদ্মা সেতুর মোট ব্যয় মূল সেতুতে ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতু উদ্বোধনের তারিখ কত?

উত্তরঃ পদ্মা সেতু উদ্বোধনের তারিখ ২০২২ সালের ২৫ জুন।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর উচ্চতা কত?

উত্তরঃ পানির স্তর থেকে পদ্মা সেতুর উচ্চতা ৬০ ফুট।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর প্রথম স্প্যান কবে বসে?

উত্তরঃ ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পদ্মা সেতুর প্রথম স্পান বসে।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুতে রেললাইন স্থাপন হবে কোথায় ?

উত্তরঃ পদ্মা সেতুতে রেললাইন স্থাপন হবে নিচ তলায়।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর ভায়াডাক্ট কত কিলোমিটার ?

উত্তরঃ পদ্মা সেতুর ভায়াডাক্ট ৩.১৮ কিলোমিটার।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর ভায়াডাক্ট পিলার কয়টি?

উত্তরঃ পদ্মা সেতুর ভায়াডাক্ট পিলার ৮১টি

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতু প্রকল্পে জনবল কতজন?

উত্তরঃ পদ্মা সেতু প্রকল্পে জনবল প্রায় ৪ হাজার।

প্রশ্নঃ পানির স্তর থেকে পদ্মা সেতুর উচ্চতা কত ?

উত্তরঃ পানির স্তর থেকে পদ্মা সেতুর উচ্চতা ৬০ ফুট।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর পাইলিং গভীরতা কত?

উত্তরঃ পদ্মা সেতুর পাইলিং গভীরতা ৩৮৩ ফুট।

প্রশ্নঃ প্রতি পিলারের জন্য পাইলিং কয়টি?

উত্তরঃ প্রতি পিলারের জন্য পাইলিং ৬টি।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর মোট পাইলিং সংখ্যা কত?

উত্তরঃ পদ্মা সেতুর মোট পাইলিং সংখ্যা ২৬৪টি।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতু প্রকল্পে চুক্তিবদ্ধ কোম্পানির নাম কী?

উত্তরঃ চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেড।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর প্রথম স্প্যান কোথায় বসানো হয়?

উত্তরঃ পদ্মা সেতুর প্রথম স্প্যান ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুটির পিলারের উপর বসানো হয়।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর শেষ ৪১ নম্বর স্প্যান কোথায় বসানো হয়?

উত্তরঃ পদ্মা সেতুর শেষ স্প্যান ১২ ও ১৩ নম্বর খুটির উপর বসানো হয়।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর ৪১টি স্প্যান বসাতে কতদিন সময় লাগে?

উত্তরঃ পদ্মা সেতুর ৪১ টি স্প্যান বসাতে তিন বছর দুই মাস দশ দিন সময় লাগে।

প্রশ্নঃ বাংলাদেশের বর্তমানে দীর্ঘতম সেতুর নাম কি?

উত্তরঃ বাংলাদেশে বর্তমানে দীর্ঘতম সেতুর নাম হচ্ছে পদ্মা সেতু।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর প্রতিটি স্প্যান এর ওজন কত?

উত্তরঃ পদ্মা সেতুর প্রতিটি স্প্যান এর ওজন ৩২০০ টন।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর স্প্যান গুলোর মোট ওজন কত?

উত্তরঃ পদ্মা সেতুর স্প্যান গুলোর মোট ওজন ১১৬৩৮৮ টন।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুতে ব্যবহৃত স্টিলের পরিমাণ কত?

উত্তরঃ পদ্মা সেতুতে ব্যবহৃত স্টিলের পরিমাণ ১৪৬০০০ মেট্রিক টন।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর সক্ষমতা কতটুকু?

উত্তরঃ পদ্মা সেতুর সক্ষমতা দৈনিক ৭৫ হাজার যানবাহন।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর আকৃতি কি রকম?

উত্তরঃ পদ্মা সেতুর আকৃতি ইংরেজি S অক্ষরের মতো।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর ভূমিকম্প সহনশীলতা কত?

উত্তরঃ পদ্মা সেতুর ভূমিকম্প সহনশীলতা রিক্টারস্কেলে ৯.১ মাত্রার কম্পন।

প্রশ্নঃ পদ্মা সেতুর আয়ুষ্কাল কত বছর?

উত্তরঃ পদ্মা সেতুর আয়ুষ্কাল ১০০ বছর।

প্রশ্নঃ কত বছরে পদ্মা সেতুর ব্যয় উঠে আসবে?

উত্তরঃ ৩৫ বছরে।

প্রশ্নঃ প্রধানমন্ত্রী কত টাকা টোল দিয়ে পদ্মা সেতুতে উঠেছেন?

উত্তরঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নগদ ২০০০ টাকা দিয়ে পদ্মা সেতুতে উঠেছেন।

প্রশ্নঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদ্মা সেতুর টোলের ট্রানজেকশন নাম্বার কতো?

উত্তরঃ ট্রানজেকশন নাম্বার – 0.0001

প্রশ্নঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কত তারিখে এবং কখন পদ্মা সেতু প্রথম টোল দেন?

উত্তরঃ তারিখ ২৫-০৬-২০২২, সময় দুপুর ১২টা ২৬ মিনিট ৫৯ সেকেন্ড।

আরও পড়ুন: