আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িং । শিক্ষা জাতীয় জীবনের সর্বতোমুখী উন্নয়নের পূর্বশর্ত। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে বাংলাদেশকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন সুশিক্ষিত-দক্ষ মানব সম্পদ। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা দক্ষ মানব সম্পদ উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান এবং আত্মনির্ভরশীল হয়ে বেকার সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ব্যাপক প্রসারের কোনো বিকল্প নেই। তাই ক্রমপরিবর্তনশীল অর্থনীতির সঙ্গে দেশে ও বিদেশে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত দক্ষ জনশক্তির চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কারণে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক এসএসসি (ভোকেশনাল) ও দাখিল (ভোকেশনাল) স্তরের শিক্ষাক্রম ইতোমধ্যে পরিমার্জন করে যুগোপযোগী করা হয়েছে।

Table of Contents
সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িং
যে ড্রয়িং ডিজাইন এবং কন্সট্রাকশন যেমন- রাস্তা, ইমারত, সেতু, বাঁধ, পানি সরবরাহ ইত্যাদি আর্থসামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহার করা হয় তাকে পুরকৌশল ড্রয়িং বা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িং বলে।
সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িং-এর কম্পোনেট বা উপাদান হচ্ছে স্থপতি ড্রয়িং (architectural drawing) এবং এই অনুসারে কাঠামোগত ড্রয়িং (structural drawing)। যে ডিজাইন স্থাপনার সৌন্দর্য ও যাবতীয় সুবিধা বৃদ্ধির উদ্দশ্যে ডিজাইনের কাজে ব্যবহার করা হয় তাকে স্থপতি ড্রয়িং বলে। মূলত স্থপতি বা ব্যবহারকারীর স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য স্থাপত্য ড্রয়িং অনুসারে যে বিস্তারিত ডিজাইন প্রণয়ন করা হয় তাকে স্ট্রাকচারাল ডিজাইন বলে।
ওয়ার্কিং ড্রইং: যে ড্রইং-এ মেশিন অথবা স্ট্রাকচার-এর (Structure) প্রতিটি অংশ স্বতন্ত্র ও বিশদভাবে উৎপাদনের জন্য যাতে পরিপূর্ণ তথ্য বর্ণনা করা থাকে এবং এর উপর নির্ভর করে কাজটি সম্পন্ন করা হয় এবং চূড়ান্তভাবে সেই অনুযায়ী কাজ বুঝে নেয়া হয় তাকে ওয়ার্কিং ড্রইং বলে।
ট্রেসিং: মূলত ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রইং বারবার অনুলিপি বা কপি করার জন্য তা ট্রেসিং পেপারে করা হয়। পরে এমোনিয়া বা ব্লু প্রিন্টের সাহায্যে অধিক কপি করা হয়। ফাইনাল ড্রইংটি অফসেট পেপারে বা সাদা কাগজে করলে তা থেকে কপি করতে ব্যয়বহুল প্রিন্ট মেশিনে করতে হয়। পক্ষান্তরে ট্রেসিং পেপার অনেক সাশ্রয়ী এবং বেশি দিন টেকসই হয়। এতে ভুল সংশোধন করাও যায়।
অ্যামোনিয়া প্রিন্ট
এই পদ্ধতিতে আলোক চেতন কাগজের উপর সূর্যের কিরণ বা বৈদ্যুতিকভাবে আলোকপাত করানো হয়। ইহা অনেকটা ব্লু-প্রিন্টিং-এর মতোই। তবে পার্থক্য এই যে, আলোকপাত করার কাগজখানিকে পানি দ্বারা ধোয়ার পরিবর্তে একটি বাক্সে রেখে ঔ বাক্সে অ্যামোনিয়া দ্বারা কাগজটিকে গ্যাসের সংস্পর্শে আনতে হয়। এর ফলে কাগজটিতে রাসায়নিক ক্রিয়া দ্বারা সাদা পটভূমির উপর লাল বা বেগুনি রঙের রেখা ভেসে ওঠে। শতকরা দশ ভাগ অ্যামোনিয়া বিশিষ্ট দ্রবণ ব্যবহার করলে এই রূপ হয়ে থাকে। পরে এই কাগজখানিকে অ্যামোনিয়া বাক্স হতে বের করে এনে মুক্ত বায়ুতে কিছুক্ষণ রাখলে গন্ধ দূর হয়ে যায়। বাজারে অ্যামোনিয়া প্রিন্টের জন্য আলাদা আলোক চেতন কাগজ পাওয়া যায়। এই ধরনের প্রিন্ট দুইভাবে নেওয়া হয়। যথা
(i) সাদা পটভূমির উপর লাল বেগুনি রেখা অ্যামোনিয়া প্রিন্ট।
(ii) সাদা পটভূমির উপর স্টিল নীল রেখা অ্যামোনিয়া প্রিন্ট।
অ্যামোনিয়া প্রিন্টকে এজো প্রিন্টও (azo prints) বলা হয়। একটি প্রেসার ফ্রেমের মধ্যে ১ থেকে ২ মিনিটের মধ্যে প্রিন্টের কাজ সম্পন্ন করা হয় এবং এরপর অ্যামোনিয়া রক্ষিত একটি চেম্বার এটা ডেভেলপড করা হয়।
বর্তমানে বৈদ্যুতিক চালিত অ্যামোনিয়া প্রিন্টিং মেশিনে অ্যামোনিয়া প্রিন্ট নেওয়া হয়। একটি সাধারণ ধরনের অ্যামোনিয়া প্রিন্টিং মেশিনে ১ থেকে ১৫টি ফ্লোরেসেন্ট টিউবস (fluresent tubes) থাকে যা এক্সপোজারের জন্য ব্যবহৃত হয়। একটি মোটর থাকে যার উপর অনেক বেল্ট চলাচল করে। ট্রেসিং এবং অ্যামোনিয়া পেপার মেশিনে দেওয়া হয় যা মোটরচালিত বেল্টের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত গতিতে মেশিনে চলাচল করে। এভাবে ড্রইংগুলো টিউবগুলোর সামনে যায়। এরপর এগুলো অ্যামোনিয়া রক্ষিত চেম্বার ডেভেলপড করা হয়।
অ্যামোনিয়া চেম্বার মেশিনের সাথেও হতে পারে আবার আলাদা বক্স হতে পারে। সাধারণত এটি আলাদা কাঠ বা স্টিলের শিটের তৈরি উলম্ব বক্স। এতে উপরে একটি দরজা এবং নিচের দিকে অ্যামোনিয়া থাকে। আলোকচেতন পেপারকে ভালোমতো অন্ধকার ঠান্ডা ঘরে এবং লাইট প্রুফ টিনের বক্সে রাখতে হবে যাতে আলোর সংস্পর্শে নষ্ট না হয়। অ্যামোনিয়া পেপারকে অ্যামোনিয়া ধোঁয়া হতে দূরে রাখতে হবে।
অ্যামোনিয়া প্রিন্টে প্রদর্শিত কাঠামোর বিভিন্ন অংশ চিহ্নিত
অ্যামোনিয়া প্রিন্টে প্রদর্শিত কাঠামোর বিভিন্ন অংশ চিহ্নিত তথা প্লান, সেকশন, এলিভেশন পাওয়ার কৌশল করার চিত্র ১৭.১ দেখানো হয়েছে।
কাঠামোর প্লান
একটি নিদিষ্ট উচ্চতা হতে কোনো ইমারতের অনুভূমিক সেকশনকে প্লান বলে। প্রচলিত ধারণা হতে একটি বিল্ডিংকে এর জানালার সিল লেভেলে (sill level) কেটে ফেলা হয়েছে কল্পনা করে উপরের কাটা অংশ সরিয়ে উপর থেকে বিল্ডিং দেখতে যেমন দেখায় তাই প্লান।
প্লানে কক্ষের অবস্থান, বারান্দা বা করিডোর দরজার অবস্থান এবং জানালাসহ অন্য কোনো ফোকর থাকলে এগুলোর মাপসহ দেখানো হয়। কক্ষের মাপ প্রন্থ দৈর্ঘ্য হিসেবে নির্দেশ করা হয়। বারান্দার রিটেইনিং ওয়াল এবং বিম, সানসেড, ভেল্টিলেটর যেগুলো সিল লেভেলের উপরে সেগুলো ডট লাইন বা ভাঙা লাইন দিয়ে দেখানো হয়।
সাধারণত ড্রইং সিটের বামদিকের নিচের অংশে পান আঁকা হয়। ইমারতের বাম দিকের শেষ দেয়াল আকার পর এবং দেয়ালের পুরুত্ব দৈর্ঘ্য বরাবর দেয়ালের দৈর্ঘ্য (উলম্ব লাইন) এবং প্রন্থ বরাবর আনুভূমিক লাইন একটি নরম পেন্সিল দিয়ে আঁকা হয়। এভাবে কক্ষ, জালানার অবস্থান দেখানো হয়। কক্ষের মাপ এবং দেয়ালের পুরুত্ব এবং সম্পূর্ণ পান সঠিকভাবে পেতে ধারালো পেন্সিল ব্যবহৃত হয়।

কাঠামোর সেকশন
সেকশনকে কখনও কখনও ভার্টিকেল সেকশন (vertical section), সেকশনাল এলিভেশন (sectional elevation) বা ক্রস সেকশনও (cross section) বলা হয়। এটি কল্পনা করা হয় যে একটি সম্পূর্ণ ইমারতকে উলম্বভাবে একটি লাইন বরাবর কাটা হলো যাতে ইমারতটি কাল্পনিক উলম্ব তল বরাবর ইমারতের ঠিক উপর হতে বুনিয়াদের নিচ পর্যন্ত দুটি অংশে ভাগ হয়ে গেল। এই কাল্পনিক তল দিয়ে বাম দিকে যে ভিউ দেখা যায় তাই পান যে স্কেলে আঁকা হয়েছিল একই স্কেলে আঁকা হয়।
পানের উপর যে লাইন এঁকে সেকশন নির্দেশ করা হয় তাকে সেকশনাল লাইন বলে এবং A-B or X-X উপস্থাপন করা হয়। তীর চিহ্নের মাথাগুলো ভালোমতো নির্দেশ করতে হবে যে কোন সেকশন ভিউকে এটি আঁকা হয়েছে। কখনও অফসেট ব্যবহার করে বিস্তারিত নির্দেশ করা হয় যাতে উলম্ব তলকে শুধু স্থান পরিবর্তন করা হয়।
সেকশনের প্রয়োজনীয়তা হচ্ছে এতে সকল প্রকার উলম্ব মাপ যেমন- বুনিয়াদের বিস্তারিত, বেজমেন্ট, ফ্লোরিং ডিটেইলস, সুপার স্ট্রাকচারের উচ্চতা, দরজা, জানালা, আলমারি, কাপবোর্ড, অন্য ফোকরের মাপ, প্যারাফেট ওয়ালের লিন্টেলের, সানসেডের প্রন্থ এবং পুরুত্ব নির্দেশ করা থাকে। নির্মাণকাজ করতে বিভিন্ন উপকরণের প্রয়োজনীয় পরিমাণ হিসাবে এবং নির্মাণকাজ পরিচালনা করতে এই বিস্তারিত তথ্যের দরকার পড়ে।
ড্রইং শিটের উপরের ডান অংশে সেকশন আঁকা হয়। সেকশন লাইনের শুরু হতে আরম্ভ করে ধীরে ধীরে আনুভূমিক মাপগুলো সেকশন এলিভেশনে উপস্থাপন করা হয়। দেয়ালের উপর হতে নিচ পর্যন্ত, দরজা- জনালার অবস্থান আঁকা হয়। ইমারতের বিভিন্ন অংশ যেমন ভিত্তি, ফ্লোর, হাদ ইত্যাদির ডিটেইলস এবং প্রয়োজনীয় তথ্য আঁকা হয়। নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বিন্নি সামগ্রী নির্দিষ্ট সাইন ব্যবহার করে আঁকা হয়।
এলিভেশন
এলিকেশন বা ফ্রন্ট ভিউ হচ্ছে সম্পন্ন হওয়া কোনো ইমারতের যে কোনো দিক থেকে দেখতে পাওয়া দৃশ্য। যখন বিল্ডিং-এর সম্মুখভাগ হতে ভিউ দেখা হয় তখন একে ফ্রন্ট এলিভেশন (front elevation) বলে। পিছনের ভিউকে রেয়ার এলিভেশন (rear elevation) এবং কোন পার্শ্ব হতে দেখলে সাট্রুড এলিভেশন (side elevation) বলে। প্লান এবং সেকশন হতে উপরের দিকে এবং অনুভূমিক দিকে প্রজেক্টিং করে এলিন্ডেশন পাওয়া যায়। এলিকেশনকে ড্রইং-এয় বাম পাশে রাখা হয় এবং এটি আসলে প্লানের উপরের অংশ। প্লান এবং সেকশন হতে দরজা, জানালা, সানসেড, দেয়াল ইত্যাদির প্রজেকশন করে এলিভেশন করা হয় এবং ড্রইং এর ডিটেইলিং করা হয়।

অ্যামোনিয়া প্রিন্ট ও নীল নকশার মধ্যে পার্থক্য
| অ্যামোনিয়া প্রিন্ট | নীল নকশা |
| সেন্সিটাইজড কাগজের উপর এই প্রিন্ট নেওয়া হয়। | সেন্সিটাইজড ফেরু পেপারের উপর নীল নকশা করা হয়। |
| কাগজকে অ্যামোনিয়া গ্যাসের সংস্পর্শে আনা হয়। | পেপারকে পানি দ্বারা ধৌত করা হয়। |
| সাদা পটভূমির উপর লাল বেগুনি রেখা অ্যামোনিয়া প্রিন্ট বা সাদা পটভূমির উপর স্টিল নীল রেখা অ্যামোনিয়া প্রিন্ট হয়ে থাকে। | এ ক্ষেত্রে নীল রঙের পটভূমির উপর সাদা রেখার সাহায্যে নকশা তৈরি করা হয়। |
| বর্তমানে বৈদ্যুতিক শক্তিচালিত অ্যামোনিয়া প্রিন্টিং মেশিন পাওয়া যায়। | নীল নকশা হাতে প্রস্তুত করতে হয়। |
| বাল্ব বা টিউব ব্যবহার করে আলোক সরবরাহ করা হয়। | সূর্যের আলো হতে তাপ গ্রহণ করে। |
| অ্যামোনিয়া প্রিন্টিং হতে ১ থেকে ২ মিনিট সময় লাগে। | নীল নকশায় তুলনামূলক সময় বেশি লাগে। |
অটোক্যাড (AutoCAD)
অটোক্যাড (AutoCAD) হচ্ছে কম্পিউটারের সাহায্যে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন (computer aided design- CAD), ড্রয়িং, ড্রাক্টিং এবং প্রিন্ট করার সফটওয়্যার। বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা, শিল্প ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে স্থপতি, ইঞ্জিনিয়ার, প্রজেক্ট ম্যানেজার, গ্রাফিক ডিজাইনার, ড্রাফ্টম্যান ও অন্য পেশাজীবীদের দ্বারা ব্যবহৃত সর্বাধিক জনপ্রিয় ও ব্যবহৃত সফটওয়্যার।
প্রায় প্রতিবছর এটি বাণিজ্যিক সফটওয়্যারের বিভিন্ন সংস্করণ বের হয়। একবার শিখে নিয়মিত অনুশীলন যে কাউকে এই সফটওয়্যারে দক্ষ করে তুলবে। ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িং-এর প্রাথমিক ধারণা এবং পরবর্তীতে অটোক্যাডের উপর স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ট্রেনিং দেশে ও বিদেশে মানসম্মত চাকরিতে সুযোগ তৈরি করে।
