একটি ইমারত বা ঘর কেবল ইট-সিমেন্টের চার দেয়াল নয়, এটি মানুষের আবেগ ও আশ্রয়ের জায়গা। আর এই আশ্রয়ের বহিরাঙ্গনকে প্রাণবন্ত, দৃষ্টিনন্দন এবং সুরক্ষিত করে তোলার অন্যতম প্রাচীন অথচ দারুণ কার্যকর একটি শিল্পের নাম ‘রঙিন চুনকাম’ বা ‘কালার ওয়াশ’ (Color Wash)। আধুনিক বাজারে নানা পদের সিন্থেটিক বা কেমিক্যাল পেইন্টের জোয়ার থাকলেও, স্থায়িত্ব, সহজলভ্যতা এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের খাতিরে রঙিন চুনকামের কদর আজও কমেনি।
বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রঙিন চুনকাম কেবল দেয়াল রাঙানোর কোনো সাধারণ সস্তা পদ্ধতি নয়। এটি মূলত চুন, পানি, প্রাকৃতিক আঠা এবং রঞ্জক পদার্থের (Pigment) এমন এক নিখুঁত রসায়ন, যা প্লাস্টার করা দেয়ালের ওপর একটি সুরক্ষাকবচ তৈরি করে। চুন প্রাকৃতিকভাবেই একটি দারুণ ‘অ্যান্টিসেপ্টিক’ বা জীবাণুনাশক উপাদান। ফলে দেয়ালকে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসমুক্ত রাখতে এবং ছত্রাক বা শ্যাওলার আক্রমণ থেকে বাঁচাতে চুনকামের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে তীব্র রোদে এবং বৃষ্টির ছাটে যখন ইমারতের বাইরের দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন রঙিন চুনকাম সেই বিরূপ আবহাওয়াকে শুষে নিয়ে ভেতরের পরিবেশকে রাখে ঠাণ্ডা ও নিরাপদ।
তবে বাইরে থেকে দেখতে এটিকে খুব সহজ মনে হলেও, একটি আদর্শ রঙিন চুনকাম করার পেছনে রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু কারিগরি ধাপ। চুনের সঠিক মিশ্রণ তৈরি, আঠার আনুপাতিক ব্যবহার, দেয়ালের উপরিভাগ বা গাত্র সুন্দরভাবে প্রস্তুত করা এবং তুলি বা ব্রাশ টানার সুনির্দিষ্ট ব্যাকরণ না জানলে কাঙ্ক্ষিত ফিনিশিং পাওয়া অসম্ভব। একটু অসাবধানতায় দেয়ালে ছোপ ছোপ দাগ পড়তে পারে কিংবা চুন শুকিয়ে খসে পড়তে পারে।
আমাদের আজকের আলোচনায় আমরা রঙিন চুনকামের সেই ভেতরের কলাকৌশল, এর মূল উদ্দেশ্য, সঠিক উপায়ে দেয়াল প্রস্তুতকরণ এবং ধাপে ধাপে চুনকাম করার পেশাদার পদ্ধতিগুলো বিস্তারিত ও সহজভাবে জেনে নেব।
রঙ্গিন চুনকাম
রঙিন চুনকামের সংজ্ঞা
কাঠামোকে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে ব্যবহার ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার জন্য প্লাস্টারকৃত ওয়েদার এক্সপোজত পৃষ্ঠদেশে (বাহিরের পৃষ্ঠদেশ) পাথুরে চুন, কলিচুন, পানি ও আঠা জাতীয় পদার্থ (যমন- গাম বা ) এবং রঙের গুঁড়া ইত্যাদি পদার্থের সংমিশ্রণে যে প্রলেপ দেয়া হয়, তাহাকে রঙিন চুনকাম (Color Wash) বলে।

রঙিন চুনকামের উদ্দেশ্য
১. কাঠামোকে বাহিরের পৃষ্ঠদেশকে কার্বন ডাই-অক্সাইডের প্রতিক্রিয়া হতে রক্ষা করার জন্য ।
২. কাঠামোতে শ্যাওলা বা সবুজ জাতীয় গাছ জন্মানো প্রতিরোধ করার জন্য।
৩. আলোকরশ্মির তেজস্ক্রিয় কমানোর জন্য। ।
৪. ইমারতের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য
৫. ঘরকে জীবাণুমুক্ত রাখার জন্য ।
রঙিন চুনকামের উপাদান
১. পাথুরে চুন।
২. কলিচুন বা ঝিনুক, ফোটান চুন।
৩. গাম বা গ্লু (আঠা জাতীয় পদার্থ)।
৪. রঙের গুঁড়া
৫. প্রয়োজনমতো বিশুদ্ধ পানি।
রঙিন চুনকাম করার জন্য দেয়ালের গাত্র প্রস্তুত করার পদ্ধতি
দেয়ালের বা কাঠামোর প্লাস্টার বা আন্তর ভালোভাবে শুকানোর পর চুনকাম করা যায়। চুনকাম করার আগে পৃষ্ঠদেশকে ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। পূর্বের সব ধরনের ময়লা বা অনিষ্টকর উপাদান বা ধূলা-বালি ঘষে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে এবং ভালোভাবে শুকানোর পর চুনকাম করতে হবে। পুরাতন চুনকামের উপর নতুনভাবে চুনকামের আগে পুরাতন চুনকাম উত্তমরূপে তুলে ফেলতে হবে এবং পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।
রঙিন চুনকাম করার পদ্ধতি
দেয়ালের বা কাঠামোর প্লাস্টার বা আন্তরকৃত পৃষ্ঠের উপর ব্রাস বা তুলি দিয়ে চুনকাম প্রয়োগ করা হয়। চুনকামের সময় একবার উপর হতে নিচে এবং পরের বার নিচ থেকে উপরে তুলি টানতে হয়। তারপর ডান হতে বামে এবং বাম হতে ডানে তুলি টেনে প্রথম কোট সম্পূর্ণ করতে হয়।
এভাবে প্রথম কোট শুকনোর পর দ্বিতীয় কোট, তারপর তৃতীয় কোট চুনকাম করতে হয়। সাধারণত নতুন কাজে তিন কোট এবং পুরাতন কাজে দুই কোট চুনকাম করতে হয়। দেয়ালের আগে সিলিং-এর চুনকাম করতে হয়। চুনকাম প্রবণের জন্মে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে চুনকাম দ্রবণকে মাঝে মধ্যে নাড়া দিতে হয়।
চুনকাম ও রঙিন চুনকামের মধ্যে পার্থক্য
চুনকাম ও রঙিন চুনকামের মধ্যে পার্থক্য নিম্নে দেয়া হলো:

অনুশীলনী – ২২
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন
১। রঙিন চুনকাম কাকে বলে?
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন
১। রঙিন চুনকামের উদ্দেশ্য লেখ?
২। রঙিন চুনকামের উপাদান কয়টি ও কী কী?
৩। রঙিন চুনকাম করার জন্য দেয়ালের গাত্র প্রস্তুত করার পদ্ধতি লেখ।
রচনামূলক প্রশ্ন
১। রঙিন চুনকাম করার পদ্ধতি বর্ণনা কর।
২। চুনকাম ও রঙিন চুনকামের মধ্যে পার্থক্য ব্যাখ্যা কর।
